
মাত্র ১০ বছর বয়সে দাখিল পাশ করা ব্যক্তি এখন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু তাই নয়, সনদ জালিয়াতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিধি আরোপ, অতি রাজনীতিকরণ, ফ্রি-স্টাইল দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ক্রমশ: অন্ধকারে নিয়ে যাওয়ার মতো বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নে অবস্থিত মাথিউরা সিনিয়র ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে।
মাথিউরা সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় এরকম অসংখ্য দূর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ বছরের পর বছর থেকে স্থানীয় মানুষের মুখে-মুখে। কিন্তু অতি রাজনীতির কারণে কখনো এসব অভিযোগ আমলে নেননি তদারকি সংশ্লিষ্টরা। এ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো: আব্দুল আলীম নিজেই জাল সনদে পদবী বাগিয়ে নেন মর্মে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেছেন এলাকাবাসী। দূর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মাদ্রাসা বিভাগের সচিব, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সিলেটের জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা অফিসারসহ বিভিন্ন দপ্তরে মাথিউরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, মাথিউরা সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম মাত্র ১০বছর বয়সে দাখিল পাশ করেছেন মর্মে নিয়োগকালীন সময়ে তার সনদ জমা দিয়েছেন। তার জমা দেয়া সনদ অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করে ১৯৭৯ সালে দাখিল পাশ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে আলীম, ১৯৮৩ সালে ফাজিল ও ১৯৮৫ সালে তিনি কামিল পাশ করেন। এছাড়াও একটি ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে যে ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন, নিয়োগকালীরন সময়ে তাও তার ছিলনা। অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে তার জমা দেয়া অভিজ্ঞতার সনদও সঠিক নয়। গত ১৮ বছর থেকে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সরকারি সুবিধাভোগীদের নিয়ে মাদ্রাসার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এই মাদ্রাসা পরিচালনায় অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম গত প্রায় দেড় যুগ থেকে ব্যক্তিগত বিধি, অতি রাজনীতিকরণ, ফ্রি-স্টাইল দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়ে প্রতিষ্টানটিকে ক্রমশ: অন্ধকারে নিয়ে গেছেন। যা এলাকাবাসীসহ স্থানীয় শিক্ষানুরাগী সচেতনমহলে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছরওয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, ২০১৮সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তায় অধ্যক্ষ নিজেই নৌকার প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল মারেন। একজন আলেম হয়ে তার এমন গর্হিত আচরণে এলাকাবাসী লজ্জিত।
মাদ্রাসার প্রতিবেশী এলাকার বাসিন্দা ও মাথিউরা ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মো. মুজিবুর রহমান অভিযোগ করেন, মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বেতন ও পরীক্ষার ফি আদায়েও সরকারি নির্দেশনা মানেননি এই অধ্যক্ষ। মাদ্রাসা পরিচালনায় দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়বে।
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুস শাকুর বলেন, প্রায় এক বছরের বেশী সময় থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে মো. আব্দুল আলীম কানাডা প্রবাসী মাদ্রাসার সহকারি মৌলভী মুহিবুর রহমানের বেতন-ভাতা আত্মসাৎ করছেন। যা তদন্ত হওয়া জরুরী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাথিউরা সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় শতাধিক। কিন্তু এমপিও ঠিকিয়ে রাখাসহ সরকারি সুবিধা পেতে নামে-বেনামে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থীর ভর্তি দেখানো হয়েছে। মাদ্রাসার ২য় শ্রেণীতে ৪জন, ৩য় শ্রেণীতে ৩ জন, ৫ম শ্রেণীতে ৪জন শিক্ষার্থী নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন। মাদ্রাসার পিছন দিকে রয়েছে পৃথক পকেট গেইট। ওই গেইট দিয়ে অধ্যক্ষ কখন আসেন আর কখন বেরিয়ে যান, তা জানেন না কেউ।
এছাড়াও অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম দীর্ঘদিন থেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ। এ কারণে মাদ্রাসার একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় তার বেশ বেগ হতে হচ্ছে। তার সনদ ও নিয়োগকালীন দূর্র্নীতি নিয়েও বিগত দিনে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে সব ধামাচাপা পড়ে যায়।
বিয়ানীবাজারের একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ (পিএইচজি) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক শাব্বির আহমদ খান জানান, তিনি ১৯৮০ সালে দাখিল পাশ করেছেন তাও ১৭ বছর বয়সে, প্রিন্সিপাল মো. আলীম উদ্দিন কিভাবে ১০ বছরে দাখিল পাশ করেছেন তা আমার বোধগম্য নয়।
অভিযোগের ব্যাপারে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম জানান, ১০ বছরে দাখিল পাশের বিষয়টি ইতোমধ্যে তদন্ত হয়ে একটি পরিপত্রের মাধ্যমে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উঠা অন্যান্য অভিযোগের কথা তিনি অস্বীকার করেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগের কথাও তিনি উড়িয়ে দেন তিনি।
প্রকাশক: আতিকুর রহমান মোহন ।। সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম সাজু
কার্যালয়: আলহাজ্ব জলিল ভিলা, মাথিউরা আরেঙ্গাবাদ, বিয়ানীবাজার, সিলেট।
দ্যা লোকাল টাইমস © ২০২৪ দ্বারা সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত৷